জল-জীবন নাটকের অজানা গল্প

জল-জীবন নাটকের অজানা গল্প, এক আত্মবিশ্বাসের নাম ছিল জল-জীবন

রাহুল রাজ : জেলে জীবন নিয়ে সমুদ্র পাড়ের মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি নিয়ে আমার লেখা জল-জীবন নাটকটি দেশ ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে অনেক সুনাম কুড়িয়েছে। দলের প্রতিটা সদস্য অসাধারণ অভিনয় করেছিল। কিন্তু এই নাটকের পিছনের আছে অনেক গল্প। অনেক ইতিহাস। ২০১৬ সালের শেষে আমি সেন্টমার্টিন দ্বীপে বেড়াতে যাই। সেখানে জেলেদের জীবন চিত্র আমি খুব কাছ থেকে দেখতে পারি।

জল ও নৌকার নিয়ে সুন্দর একটি নাটকের প্লাট আমার মাথায় আসে। ঢাকাতে ফিরে নাটকের কাহিনী সংক্ষেপ লেখে ফেলি। তার দু’দিন পেরই বিটিভিতে আমাদের খোলশ নাটকের ধারণ ছিল। নাটক শেষ হতেই বিটিভি থেকে হঠ্যৎ আমাকে বলা হয় ঈদের জন্য বিশেষ কোন নাটক তৈরি আছে কিনা? পাঁচ দিন পরেই ধারণ হবে। আমি দলের সবার সাথে কথা বলে জানিয়ে দেই আমাদের নাটক রেডি আছে।

যথা সময় আমরা করতে পারবো। বাসায় ফিরেই জল-জীবন লেখায় মন দেই। দলের কোন সদস্য কোন চরিত্র করবে তা ঠিক করেই নাটক লেখা এগিয়ে চলতে থাকে। কাপের পর কাপ কফি শেষ হতে থাকে আর নাটকের বিভিন্ন দৃশ্য লেখা এগিয়ে চলতে থাকে।

দু দিনে নাটকের একটি রূপ রেখা দাঁড়িয়ে যায়। ৫০ মিনিট মাথায় রেখে লেখতে হচ্ছিল নাটকটি। বিটিভিতে চান্দার অভিনয় করা অভিনেত্রী তৃতীয় দিন সকালে আমার বাসায় আসে। তার মুখের একটি সংলাপ আমি নাটকের ডায়লগ হিসেবে লেখে ফেলি। যেমন : আমারে দশটা টাকা দাও তালি পরে একটা বুদ্ধি দিতে পারি। নাটকের শেষ দৃশ্য করুন পরিনতি দিয়ে নাটকের পান্ডুলিপি শেষ করি।

এবার শুরু হয় মহড়ার পালা। হাতে সময় মাত্র ২ দিন। নাটকের বিভিন্ন চরিত্র খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। বড় বড় সংলাপ সেই সাথে অভিনয়ের মুভমেন্ট। সব মিলিয়ে বেশ কঠিন পরিক্ষা দিতে হয়েছিল সবাইকে। যথা দিন বিটিভিতে সবাই খুব সুন্দর অভিনয় করে। ঈদের তৃতীয় দিন বিটিভিতে নাটকটি প্রচার হয়ে সবার খুব প্রশংসা কুড়িয়ে সেরা নাটকের সম্মান অর্জন করে নেয়। একি বছর সেই সদস্যদের অভিনয়েই নাটকটি জাতীয় নাট্য উৎসবে শিল্পকলায় সংগীত ও নৃত্য মঞ্চে মঞ্চায়ন হয়। হল ভর্তি দর্শকের মুহুর মুহুর করোতালি আর নাটক শেষে দর্শকদের চোখের জলে অনেক প্রশংসা কুঁড়ায়।

২০১৭ সালের ভারতের দিল্লীতে তাজ রং আন্তর্জাতিক নাট্য উৎসবে জল-জীবন নাটক মঞ্চায়নের আমন্ত্রণ আসে। দলে সবাই সেই উৎসবের জন্য পাসপোর্ট তৈরি করে এবং মহড়ায় ব্যস্ত সময় কাটাতে থাকে। নব্বই শতাংশ মহড়া শেষে ও সবার পাসপোর্ট তৈরি হয়ে যাবার পরে দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে কাব্য বিলাস নাট্য গোষ্ঠীর আট সদস্যকে দল থেকে বহিঃস্কার করা হয়। যার ফলে চাঁদপুরের বিজয় মেলা ও দিল্লীতে জল-জীবন মঞ্চায়ণ থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। সে বছর আর দেশের বাহিরে শো করা হয়েছিল না কাব্য বিলাস নাট্য গোষ্ঠীর। বাঁধা মানেই পরাজয় না। আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াই। ২০১৮ সালে জাতীয় নাট্য উৎসবে কাব্য বিলাস কপাল নাটক মঞ্চায়ণ করে।

এবং একি বছর সেই কপাল নাটক নিয়ে অংশগ্রহন করে কোলকাতার প্রথম আন্তর্জাতিক নাট্য উৎসবে। এর পরেই আবার জল-জীবন মঞ্চে আনার চিন্তা করা হয় এবং ২০১৯ সালের কোলকাতা আন্তর্জাতিক নাট্য উৎসবে মঞ্চায়নের চূড়ান্ত সিধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু চাঁন্দা, মেঘলা, কলি, ও টুনির অভিনয়ের জন্য দলের অন্য সদস্যরা পুরোপুরি তৈরি ছিল না। চলছিল কড়া মহড়া। এদিকে হলদার চরিত্র বারে বারে পরিবর্তন হচ্ছিল।

প্রথমে হালদার ও চাঁন্দার চরিত্রে অনুশীলন করে মামুন ও চাঁদনী। কিন্তু মামুনের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হবার কারণে তিনি যথা সময় না যেতে পারার কারণে হালদার চরিত্র পুরোপুরি মনোনিবেশ করে মেহেদী। নাটকের দুই কেন্দ্রীয় চরিত্র হালদার ও চাঁন্দায় কেউ পাঁকাপাকি স্থায়ী হচ্ছিল না। সমস্যা দেখা দেয় কলি, বসু এবং ভিলেন গেদু ও লটকার চরিত্র নিয়েও। মেহেদী ও চাঁদনীর পরিক্ষার সূচী প্রকাশ হওয়াতে তারাও দলের সাথে উৎসবে যেতে পারেনি। বসু চরিত্রের হৃদয় অফিস থেকে ছুটি ম্যানেজ করতে না পারায় বড় সমস্যা দেখা দেয়। এই সমস্যায় নাঈম আহম্মেদ একটি সিধান্তের কথা জানায়।

সে বলে ভিলেন দুজনের সংলাপ এক জনের করে নেবে। মাহিন হয়ে যায় লাঠিয়াল। যদিও মূল নাটকে কোন লাঠিয়ালের চরিত্র নেই। চাঁন্দার চ্যালেঞ্জিং চরিত্র পেয়ে যায় জেনিষা, আর টুনি পারিষা এবং হালদার চরিত্রে মঞ্চে ওঠা লাগে আমার। এদিকে দলের সবচেয়ে দূর্বল অভিনেতা অন্তর সরকার নিজের উপর আত্মবিশ্বাস রাখে। আশরাফুল করে মাঝির চরিত্র। বাসু সব চেয়ে ইমোশনাল চরিত্রে অভিনয় করে রিগ্ধ যা ছিল তার জন্য সম্পূর্ন নতুন অভিজ্ঞতা। ১৩ সদস্যের দল নিয়ে ৯ ডিসেম্বর ২০১৯ কোলকাতায় পৌচ্ছায় কাব্য বিলাস নাট্য গোষ্ঠী। সল্টলেকে ১৩ ডিসেম্বর বিশ্বের ১৩ দলের সাথে বাংলাদেশের পতাকা উড়েছিল। হল ভর্তি দর্শকের সামনে মঞ্চায়ণ হয় জল-জীবন। মঞ্চের সামনেই নাট্য সমালোচক, সাংবাদিক, টলিউডের নামকরা অভিনেতাদের সাথে খুতখুতে কোলকাতার দর্শক উপস্থিত ছিলো।

নাটক শেষ সবাই মুহুর মুহুর করোতালি আর পরদিন আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রশংসা করে বিশাল সংবাদ ‘ কোলকাতা মাতালো বাংলাদেশের জল-জীবন’ সেদিনের নড়বড়ে দলের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছিল অন্য দল গুলো। সাথে সাথে নেপাল থেকে আসা দল আমন্ত্রণ জানায় তাদের দেশে এই নাটকটি মঞ্চায়ণের। শশীর মাঝির বোনের ভূমিকার উতালতা, মনিকা বিশ্বাসে ঠাকুমার রূপ, পারিষার দূরন্তপানা, নাঈমের খলনায়কের অভিনয়ের সাথে অন্তরের কান্নার দৃশ্যে আমি ও দর্শকেরা হয়েছিল বাকরুদ্ধ।

অন্তর সরকার এর পর থেকে নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে চলে আসে। তার জন্য শুরু হয় আমার আলাদা করে চরিত্র লেখা। শুধু আত্মবিশ্বাসে মানুষ সব জয় করতে পারে তা আবার প্রমাণ করে কাব্য বিলাস নাট্য গোষ্ঠী। সেই সেন্টমার্টিন দ্বীপে বসে যে গল্প আমি তৈরি করেছিলাম সেই নাটক আমারি নির্দেশনায় বাস্তাব ভাবে ফুঁটিয়ে তুলতে পেরে আবার ও বুঝতে পেরেছিলাম কারো জন্য কোন কিছু ঠেকে থাকে না। নিজের ইচ্ছা ও আত্মবিশ্বাসে অনেক বড় বাধাই জয় করা যায়।

স/এষ্